সেদিন সন্ধ্যে
নামছিল পাহাড়ের কোলে। আকাশটা ধূসর হয়ে এসেছে, দূরের বরফ-ঢাকা চূড়াগুলো যেন কালো ছায়া হয়ে
দাঁড়িয়ে। হোম-স্টে-র বারান্দায় বসে অরিন্দম চা খাচ্ছিল। কলকাতার হইচই থেকে
পালিয়ে এসেছে সে, একা। কোনো নেট
নেই, কোনো লোকজন নেই—শুধু
পাইনের গন্ধ আর ঠান্ডা হাওয়া। ভালোই লাগছিল।
হঠাৎ পাশের
চেয়ারে কে যেন বসল। অরিন্দম চমকে তাকাল। একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্রলোক—ফ্যাকাশে মুখ,
চোখে একটা অদ্ভুত ছায়া।
কালো শাল জড়ানো, মাথায় টুপি।
ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, "আমি অমিতাভ।
এখানে নতুন এসেছি। আপনি?"
"অরিন্দম। ছুটি
কাটাতে।" অরিন্দম একটু অবাক। এতক্ষণ তো কাউকে দেখেনি।
ভদ্রলোক চা-টা এক
চুমুক দিয়ে বললেন, "আমিও আগে এসব
বিশ্বাস করতুম না। ভূত-প্রেত, পিশাচ-টিশাচ...
সব বাজে কথা। কিন্তু গত বছর এপ্রিলে আমার সঙ্গে যা ঘটল, তাতে মাথা ঘুরে গেছে।"
অরিন্দম মনে মনে
হাসল। আবার একটা গাঁজাখুরি গল্প শুরু হল। কিন্তু সন্ধ্যের এই নিস্তব্ধতায়,
পাহাড়ের ছায়া লম্বা
হয়ে আসছে—শুনতে মন্দ লাগবে না। সে বলল, "বলুন না, কী হয়েছিল?"
অমিতাভবাবু চোখ
সরু করে তাকালেন। "আমার বাড়ির বাগানে, সকালবেলা। চা খাচ্ছি, পাশে আমার কুকুর রাজা—একটা বড় জার্মান
শেফার্ড। হঠাৎ একটা পচা, ভয়ঙ্কর গন্ধ
ভেসে এল। রাজা গজরাজ করে উঠল। আমি মুখ তুলে দেখি—বাগানের গেট খোলা। আর সেখান দিয়ে
ঢুকছে একটা লোক... না, লোক বলা যায় না
ঠিক।
সারা গা ছাই মাখা,
লাল কাপড় পরা, কপালে লাল-হলুদের টিপ। চোখ দুটো জ্বলছে লাল
আগুনের মতো। হাতে একটা মড়ার খুলি, আর একটা হাড়ের
টুকরো। গলায় হাড়ের মালা ঝুলছে। জটা বাঁধা, কিন্তু সেই জটায় যেন পোকা-মাকড় ঘুরছে। পচা
গন্ধটা তার গা থেকেই আসছে।
সে এসে আমার
সামনে দাঁড়াল। খুলিটায় হাড় ঠুকে ঠুকে কী সব বিড়বিড় করল। তারপর আমার দিকে
তাকিয়ে বলল, 'বাবু, পাঁচশো এক টাকা দাও। চার দিন পর অমাবস্যা।
শ্মশানে পিশাচের ভোগ চড়াতে হবে। খরচ দে। না দিলে...'
আমি তো রেগে
আগুন। এইসব ভণ্ড তান্ত্রিকদের দেখলেই গা জ্বলে। বললুম, 'দূর হ! টাকা-পয়সা নেই। যা তোর শ্মশানে।'
রাজাকে ডাক দিলুম,
'রাজা, ধর!' রাজা লাফ দিয়ে গেল।
লোকটা হাসল।
দাঁতগুলো কালো, পচা। বলল,
'ভালো কথা বলছিস না।
পিশাচের ক্ষিদে মেটাতে হবে। না হলে তোর বাড়িতে ছায়া পড়বে।' তারপর মন্ত্র পড়তে লাগল—আওয়াজটা যেন গলার
ভেতর থেকে বেরোচ্ছে, না মানুষের গলা।
রাজা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, লেজ গুটিয়ে
কাঁপতে লাগল। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, 'বেরো এখান থেকে!'
সে আর কিছু না
বলে ঘুরে চলে গেল। গেট দিয়ে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। পচা গন্ধটা রয়ে গেল
বাতাসে। রাজা ফিরে এসে আমার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল, কাঁপছে।
বউ এসে বলল,
'কী হয়েছে? কেন চেঁচাচ্ছ?' আমি সব বললুম। সে ভয় পেয়ে গেল। 'একটু টাকা দিলেই পারতে। সংস্কারের খাতিরে।'
আমি হেসে উড়িয়ে দিলুম। 'ওসব বাজে কথা।'
কিন্তু অরিন্দম,
সেই অমাবস্যার রাতে... যা
ঘটল, তা আমাকে বদলে দিয়েছে।
আমি আর আগের অমিতাভ নেই।"
অমিতাভবাবু চুপ
করলেন। বারান্দার আলোটা কাঁপছে। দূরে পাহাড়ের ছায়া যেন একটু নড়ল। অরিন্দমের
গা-টা শিরশির করে উঠল। সে হাসার চেষ্টা করল, "তারপর কী হল?"
অমিতাভবাবু
ফ্যাকাশে হেসে বললেন, "পরে বলব। আজ
রাতটা ভালো করে ঘুমোও। অমাবস্যা এখনো দূরে নেই।"
বাতাসটা হঠাৎ
ঠান্ডা হয়ে গেল। অরিন্দমের মনে হল, কেউ যেন বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে আছে—ছাই-মাখা, লাল চোখ।
সেই সন্ধ্যের পর
থেকে অরিন্দমের মনটা অস্থির। অমিতাভবাবুর গল্পটা মাথায় ঘুরছে। হাসির কথা ভেবে
হাসতে গিয়েও গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘুম আসছে না। হোম-স্টে-র ঘরটা ছোট, কাঠের দেয়াল, জানালা দিয়ে পাহাড়ের কালো ছায়া দেখা যায়।
বাইরে হাওয়া বইছে, পাইনের পাতা খসখস
করছে—যেন কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে।
পরের দিন সকালে
অরিন্দম বারান্দায় গেল। অমিতাভবাবু নেই। চেয়ারটা খালি। শুধু একটা পুরনো শাল পড়ে
আছে। অরিন্দম তুলে নিল—শালে একটা হালকা পচা গন্ধ। মনে হল গতকালের গল্পটা সত্যি নয়
তো? কিন্তু না, গন্ধটা সত্যি।
দিন কাটল।
সন্ধ্যে নামল। আজ অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই, তারাও লুকিয়ে। হোম-স্টে-র মালিক বললেন,
"আজ রাতে বাইরে বেরোবেন
না। পাহাড়ে লোকে বলে, অমাবস্যায়
শ্মশানের দিকে যাওয়া উচিত নয়।" অরিন্দম হেসে উড়িয়ে দিল। "আমি তো
বিজ্ঞানমনা মানুষ। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস নেই।"
রাত দশটা।
অরিন্দম ঘরে বসে বই পড়ছে। হঠাৎ দরজায় টোকা। টক... টক... টক...। ধীরে ধীরে,
যেন কেউ ইচ্ছে করে আওয়াজ
কমিয়ে দিচ্ছে। অরিন্দম উঠে দরজা খুলল। বাইরে কেউ নেই। শুধু ঠান্ডা হাওয়া মুখে
এসে লাগল। আর সেই পচা গন্ধ—এবার জোরালো।
সে দরজা বন্ধ করে
ফিরল। জানালার কাচে কী যেন ছায়া পড়ল। অরিন্দম তাকাল। কিছু নেই। কিন্তু মনে হল,
কেউ দাঁড়িয়ে
আছে—ছাই-মাখা গা, লাল চোখ। সে চোখ
বুজল, খুলল। না, কিছু নেই। "আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি?"
মনে মনে বলল।
রাত বাড়ল।
বারোটা। হঠাৎ বাইরে কুকুর ডাকল—একটা লম্বা, ভয়ঙ্কর চিৎকার। অরিন্দমের ঘরের পাশের ঘরে
অমিতাভবাবু থাকেন। সে ভাবল, দেখে আসি। দরজা
খুলে বারান্দায় বেরোল। অন্ধকার। টর্চ জ্বালাল। আলো পড়ল অমিতাভবাবুর ঘরের
জানালায়। জানালা খোলা। ভেতরে আলো নেই।
অরিন্দম ডাকল,
"অমিতাভবাবু? আছেন?"
কোনো উত্তর নেই।
শুধু একটা খসখস শব্দ—যেন কেউ হাড় ঘষছে। অরিন্দম এগোল। জানালা দিয়ে উঁকি মারল।
ভেতরে অমিতাভবাবু
বিছানায় বসে। চোখ বোজা। মুখ ফ্যাকাশে। তার সামনে মেঝেতে একটা ছোট বৃত্ত আঁকা—লাল
রঙে। মাঝখানে একটা মড়ার খুলি। আর খুলির পাশে... সেই লোকটা। ছাই-মাখা, লাল কৌপীন, হাতে হাড়ের মালা। চোখ লাল, জ্বলছে। সে মন্ত্র পড়ছে—আওয়াজ নিচু, গলার ভেতর থেকে।
"পিশাচ...
পিশাচ... ভোগ চাই... রক্ত চাই..."
অমিতাভবাবুর গলা
থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ বেরোচ্ছে—যেন কেউ গলা টিপে ধরেছে। তার চোখ খুলল। চোখ দুটো
লাল। সে অরিন্দমের দিকে তাকাল। মুখে হাসি—কিন্তু হাসি নয়, দাঁত বের করে একটা ভয়ঙ্কর ছবি।
"এসেছিস? টাকা দিবি না? তাহলে... তোরও ভাগ আছে।"
অরিন্দম পিছিয়ে
গেল। পা কাঁপছে। টর্চ পড়ে গেল। অন্ধকার। শুধু লাল চোখ দুটো জ্বলছে। পচা গন্ধটা
চারদিকে। কুকুরের চিৎকার থেমে গেছে। এখন শুধু মন্ত্রের আওয়াজ—আর অমিতাভবাবুর গলা
থেকে বেরোচ্ছে একটা অমানুষিক হাসি।
অরিন্দম ছুটে ঘরে
ফিরল। দরজা বন্ধ করল। কিন্তু দরজায় আবার টোকা—টক... টক... টক...। এবার জোরে। আর
বাইরে থেকে ফিসফিস—
"পাঁচশো এক...
দে... না হলে... পিশাচ তোকে খাবে..."
অরিন্দমের হাত-পা
ঠান্ডা। সে বুঝল—এটা আর গল্প নয়। এটা সত্যি। আর অমাবস্যা এখনো শেষ হয়নি।
দরজায় টোকা
পড়ছে—টক... টক... টক...। প্রত্যেকটা আওয়াজ যেন হৃৎপিণ্ডে লাগছে। অরিন্দম দরজার
পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। হাতে মোবাইল, কিন্তু নেট নেই। টর্চের ব্যাটারি ফুরিয়েছে। ঘর অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে
পাহাড়ের কালো ছায়া। আর বাইরে থেকে সেই ফিসফিস—
"পাঁচশো এক...
দে... পিশাচের ক্ষিদে... মেটাতে হবে..."
অরিন্দম মনে মনে
বলল, "এটা স্বপ্ন। আমি
ঘুমিয়ে আছি। উঠে পড়ি।" কিন্তু গা-টা ঠান্ডা, ঘাম হচ্ছে। সে দরজার কাছে কান লাগাল। বাইরে
কোনো পায়ের আওয়াজ নেই। শুধু হাওয়া আর... একটা খসখস শব্দ। যেন হাড়ের মালা ঝুলছে,
ঘষা খাচ্ছে।
হঠাৎ টোকা থেমে
গেল। নিস্তব্ধতা। অরিন্দম একটু সাহস করে দরজার চাবি খুলল। ফাঁক করে তাকাল।
বারান্দা খালি। কিন্তু মেঝেতে... কী যেন পড়ে আছে। একটা ছোট কাগজ। সে হাত বাড়িয়ে
তুলল। কাগজে লাল সিঁদুর দিয়ে লেখা—একটা অদ্ভুত চিহ্ন, আর নিচে: "অমাবস্যা শেষ হয়নি। তোর ঘরে
ছায়া এসেছে।"
অরিন্দমের হাত
কাঁপল। কাগজটা ফেলে দিল। পিছনে ফিরে দেখল—ঘরের কোণে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। না,
ছায়া নয়। সেই লোকটা।
ছাই-মাখা গা, লাল চোখ জ্বলছে।
হাতে খুলি। সে হাসছে—দাঁত কালো, পচা।
"টাকা দিবি না?
তাহলে... তোর বন্ধুকে
নিয়ে যাই।"
অরিন্দম চেঁচিয়ে
উঠল, "কে তুমি? চলে যাও!" কিন্তু গলা থেকে আওয়াজ
বেরোচ্ছে না। যেন গলা টিপে ধরা। লোকটা এগোল। পচা গন্ধটা ঘর ভরে গেল। অরিন্দম
পিছিয়ে বিছানায় পড়ল। লোকটা কাছে এসে দাঁড়াল। খুলিটা অরিন্দমের মুখের সামনে
ধরল। ভেতরে... কী যেন নড়ছে। পোকা। না, চোখ। একটা ছোট চোখ তাকিয়ে আছে।
"পিশাচের ভোগ...
রক্ত চাই। তোর রক্ত।"
অরিন্দম চোখ
বুজল। মনে হল সব শেষ। কিন্তু হঠাৎ বাইরে একটা আওয়াজ—কুকুরের চিৎকার। না, রাজা নয়। হোম-স্টে-র কোনো কুকুর। লোকটা থমকে
গেল। তার চোখ সরু হল। "আজ না... কাল... অমাবস্যা পুরোপুরি শেষ হলে..."
সে ঘুরে অন্ধকারে
মিলিয়ে গেল। পচা গন্ধটা রয়ে গেল। অরিন্দমের গা-টা ঠান্ডা। সে উঠে দাঁড়াল। দরজা
খুলে বারান্দায় বেরোল। অমিতাভবাবুর ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে—মোমবাতি।
অরিন্দম এগোল।
ভেতরে অমিতাভবাবু
বিছানায় শুয়ে। চোখ খোলা। কিন্তু চোখ লাল। মুখে হাসি। সে বলল, "এসেছিস? ভালো। পিশাচ তোকে চেনে এখন। টাকা না দিলে...
সবাইকে নেবে। আমি তো দিয়েছি... নিজের রক্ত দিয়ে।"
অরিন্দম
দেখল—অমিতাভবাবুর হাতে একটা কাটা দাগ। রক্ত শুকিয়ে গেছে। আর মেঝেতে... একটা ছোট
বোতল। ভেতরে লাল তরল। রক্ত।
অরিন্দম পিছিয়ে
গেল। "এটা কী করেছেন আপনি?"
অমিতাভবাবু হাসল।
"পিশাচকে শান্ত করতে। কিন্তু সে আরও চায়। তোরটা চায়। অমাবস্যা শেষ হয়নি...
এখনো রাত আছে।"
হঠাৎ মোমবাতিটা
নিভে গেল। অন্ধকার। অরিন্দম ছুটে বাইরে বেরোল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল—পাহাড়ের
দিকে একটা লাল আলো জ্বলছে। শ্মশানের দিকে। আর সেখান থেকে... ফিসফিস ভেসে আসছে।
"আয়... আয়...
ভোগ চড়া..."
অরিন্দম
বুঝল—এখনো শেষ হয়নি। পিশাচের ছায়া তার ওপর পড়েছে। আর অমাবস্যার রাত শেষ হওয়ার
আগে... কিছু একটা করতে হবে। না হলে...
অরিন্দমের পা
কাঁপছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে—দূরে সেই লাল আলো জ্বলছে,
যেন শ্মশানের চিতা থেকে
উঠে আসা আগুন। ফিসফিস ভেসে আসছে বাতাসে: "আয়... ভোগ চড়া... রক্ত
দে..." অমিতাভবাবুর ঘর থেকে আর কোনো আওয়াজ নেই। শুধু নিস্তব্ধতা। অরিন্দম
বুঝল—এখন আর পালানোর উপায় নেই। পিশাচের ছায়া তার ওপর পড়েছে। যদি না যায়,
তাহলে এই হোম-স্টে-র
সবাই... হয়তো সকাল দেখবে না।
সে ঘরে ফিরল।
টেবিলে তার ব্যাগ। ভেতরে কিছু টাকা আছে। পাঁচশো এক টাকা? হাসি পেল। "এত সস্তায় পিশাচ কেনা যায়?"
মনে মনে বলল। কিন্তু
হাসিটা ভয়ে মিশে গেল। সে একটা টর্চ নিল, একটা ছোট ছুরি, আর টাকা গুনে
একটা খামে ভরল। "যদি এটাই চায়... দিয়ে দেখি।" কিন্তু মন বলছে—এটা
টাকার ব্যাপার নয়। এটা রক্তের।
রাত দুটো।
অরিন্দম বাইরে বেরোল। হোম-স্টে-র গেট খোলা। পাহাড়ের পথ ধরে নামতে লাগল। পথটা সরু,
পাথরে ভরা। টর্চের আলো
কাঁপছে। চারদিকে পাইনের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। হঠাৎ পেছনে পায়ের আওয়াজ।
অরিন্দম ঘুরল। কেউ নেই। কিন্তু পচা গন্ধটা আবার। সে দৌড়াল।
শ্মশানে পৌঁছল।
ছোট একটা জায়গা—পুরনো চিতার ছাই, কয়েকটা খুলি
পড়ে আছে। মাঝখানে একটা বড় পাথর। তার ওপর লাল সিঁদুরের চিহ্ন। আর সামনে... সেই
লোকটা। ছাই-মাখা, লাল চোখ। হাতে
খুলি। পাশে অমিতাভবাবু দাঁড়িয়ে—চোখ লাল, মুখে অদ্ভুত হাসি।
"এসেছিস?"
লোকটা বলল। আওয়াজটা যেন
মাটি থেকে উঠছে। "টাকা এনেছিস?"
অরিন্দম খামটা
এগিয়ে দিল। "এই নাও। পাঁচশো এক। এবার ছেড়ে দাও।"
লোকটা হাসল। খামটা
নিল না। খুলিটা অরিন্দমের দিকে ধরল। "টাকা নয়। রক্ত চাই। তোর রক্ত। পিশাচের
ভোগ।"
অরিন্দম পিছিয়ে
গেল। "না! আমি বিশ্বাস করি না এসবে!"
লোকটা মন্ত্র
পড়তে লাগল। হঠাৎ বাতাস উঠল। ছাই উড়তে লাগল। অমিতাভবাবু এগিয়ে এল। তার হাতে একটা
ছুরি। "দে... তোর রক্ত দে। তাহলে শান্তি পাবি। আমি দিয়েছি... এখন তোর
পালা।"
অরিন্দম ছুরিটা
বের করল। "থামুন! এটা পাগলামি!"
কিন্তু
অমিতাভবাবু হাসছে। চোখ দুটো জ্বলছে। হঠাৎ লোকটা চিৎকার করে উঠল—একটা অমানুষিক
আওয়াজ। শ্মশানের চারদিক থেকে ছায়া উঠতে লাগল। কালো, লম্বা ছায়া। পিশাচের ছায়া। অরিন্দমের গা ঘিরে
ধরল। ঠান্ডা... খুব ঠান্ডা।
অরিন্দম চেঁচাল,
"না!" সে ছুরি দিয়ে
লোকটার দিকে তাক করল। কিন্তু লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু খুলিটা পড়ে রইল।
অরিন্দম খুলিটা তুলল। ভেতরে... একটা ছোট কাগজ। লাল সিঁদুরে লেখা: "টাকা নয়।
বিশ্বাস দে। না দিলে... ছায়া তোকে ছাড়বে না।"
অরিন্দমের মাথা
ঘুরল। সে বুঝল—এটা বিশ্বাসের খেলা। অবিশ্বাস করলে পিশাচ আরও শক্তিশালী হয়। সে
খুলিটা ফেলে দিল। চিৎকার করে বলল, "আমি বিশ্বাস করি! কিন্তু তোমাকে ভয় পাই না!"
হঠাৎ সব থেমে
গেল। ছায়াগুলো সরে গেল। লাল আলো নিভে গেল। অমিতাভবাবু মাটিতে পড়ে গেল। তার চোখ
স্বাভাবিক। সে ফিসফিস করে বলল, "ধন্যবাদ... তুই বিশ্বাস করলি... পিশাচ চলে গেল।"
অরিন্দম
অমিতাভবাবুকে ধরে দাঁড় করাল। দুজনে শ্মশান থেকে ফিরতে লাগল। সকাল হচ্ছে। আকাশ
ফর্সা। কিন্তু অরিন্দমের মনে একটা ছায়া রয়ে গেল। পিশাচ চলে গেছে... নাকি লুকিয়ে
আছে? তার হাতে এখনো পচা গন্ধ
লেগে আছে।
সকাল হয়েছে।
পাহাড়ের কুয়াশা সরে গেছে, সূর্য উঠেছে।
অরিন্দম আর অমিতাভবাবু হোম-স্টে-তে ফিরলেন। দুজনেরই গা-টা ক্লান্ত, চোখ লাল। অমিতাভবাবু এখন স্বাভাবিক—চোখের লাল
আভা চলে গেছে, হাসিটা আবার
মানুষের মতো। সে বলল, "তুই না বিশ্বাস
করতিস না... কিন্তু শেষে করলি। পিশাচ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না। তুই বিশ্বাস করে
তাকে দুর্বল করে দিলি।"
অরিন্দম চুপ করে
শুনল। তার হাতে এখনো পচা গন্ধ লেগে আছে—যেন ধোয়া যাচ্ছে না। সে ঘরে ফিরে ব্যাগ
গোছাতে লাগল। "আমি কালই চলে যাব কলকাতা। এখানে আর থাকতে পারছি না।"
অমিতাভবাবু মৃদু
হেসে বলল, "যা। কিন্তু মনে
রাখিস—পিশাচের ছায়া যায় না। শুধু লুকিয়ে থাকে। যখন আবার অবিশ্বাস করবি... তখন
ফিরে আসবে।"
অরিন্দম হাসার
চেষ্টা করল। "আমি এখন বিশ্বাস করি। আর ভয়ও পাই না।" কিন্তু মনে মনে
জানে—এটা পুরো সত্যি নয়।
কলকাতায় ফিরল
অরিন্দম। ব্যস্ত রাস্তা, হইচই, আলো—সবকিছু আগের মতো। কিন্তু রাতে ঘুম আসে না।
জানালার কাছে দাঁড়ালে মনে হয় কেউ তাকিয়ে আছে। পচা গন্ধটা মাঝে মাঝে ভেসে
আসে—বাসের ধোঁয়া ভেবে উড়িয়ে দেয়।
এক রাতে, অমাবস্যা। অরিন্দমের ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ চলে
গেছে। অন্ধকার। সে মোমবাতি জ্বালাল। টেবিলে একটা খাম পড়ে আছে—কোথা থেকে এল কে
জানে। খাম খুলল। ভেতরে একটা ছোট কাগজ। লাল সিঁদুরে লেখা: "পাঁচশো এক... এখনো
বাকি।"
অরিন্দমের হাত
কাঁপল। সে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলল। "আমি বিশ্বাস করি... কিন্তু তোকে আর ভয় পাই
না!" চিৎকার করে বলল।
হঠাৎ মোমবাতিটা
নিভে গেল। অন্ধকারে একটা ফিসফিস—খুব কাছে। "ভালো... বিশ্বাস রাখিস। কারণ
ছায়া তোর সঙ্গেই আছে।"
সকালে বিদ্যুৎ
ফিরল। অরিন্দম উঠে দেখল—খামটা নেই। ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো মেঝেতে পড়ে। কিন্তু
একটা টুকরোয় এখনো লাল সিঁদুরের দাগ। সে হাসল—এবার সত্যি হাসি। "আচ্ছা...
থাকিস। কিন্তু আমি তোকে আর ডাকব না।"
সে জানালা খুলল।
বাইরে কলকাতার সকাল। হাওয়া বইছে। পচা গন্ধটা আর নেই। নাকি... খুব হালকা, দূরে?
অরিন্দম দরজা
বন্ধ করল। জীবন চলছে। কিন্তু মনে একটা ছোট ছায়া রয়ে গেল—যেন কেউ বলছে,
"আবার দেখা হবে।"
No comments:
Post a Comment